নামাজের জামাতে ইকামাত দেবার সময় মুসল্লিরা কখন দাঁড়াবে।

بسم الله الرحمن الرحيم

এ বিষয়ে আসলে সম্মানীত উলামায়ে কেরাম থেকে অনেক মতামত পাওয়া যায়। আর এই সবক’টি মতের উপরই আমল সুযোগ রয়েছে। কোন আলেমই অন্য বক্তব্যের উপর আমলকারীকে গোনাহগার বলে সাব্যস্ত করেননি। সেই সাথে এমন কোন প্রমাণও বিদ্যমান নাই , যার দ্বারা উক্ত ব্যক্তি গোনাহগার প্রমানিত হয়ে থাকেন। ইলাউস সুনান গ্রন্থের  চতুর্থ খন্ডে এসব বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।

কতিপয় নির্ভরযোগ্য ফক্বীহ লিখেছেন, “কোন কোন বর্ণনায় ‘হাইয়্যা আলাল ফালাহ’ এর সময় দাড়ানোর যে প্রমাণ রয়েছে এর আসল উদ্দেশ্য হল, এটি হল শেষ সীমা। অর্থাৎ এর পর আর বসে থাকবে না। এর দ্বারা উদ্দেশ্য এটা নয় যে, এর আগে বসে থাকতেই হবে, দাড়ানো যাবে না। বরং উদ্দেশ্য হল, সীমা নির্দিষ্টকরণ। এরপর আর বসে থাকা যাবে না। দাঁড়িয়েই পড়তে হবে। কেননা এর পর নামাজ শুরু হয়ে যাবে।।

আর এ কারনেই ইলাউস সুনানে এ বিষয়ে সকল বক্তব্য উদ্ধৃত করার পর আল্লামা তাহতাবী রহঃ এর বক্তব্য নকল করা হয়েছে-

والظاهر احتراز عن التاخير لا التقديم، حتى لو قام اول الإقامة لا بأس به (اعلاء السنن، باب وقت قيام الإمام والمأمومين للصلاة-4/328، ادارة القرآن كرتاشى)

স্পষ্ট হল এই যে, এর চেয়ে [হাইয়া আলাল ফালাহ এর চেয়ে] দেরী করা যাবে না, কিন্তু আগে করা যাবে না এমন নয়। সুতরাং কেউ যদি ইকামতের শুরুতেই দাড়িয়ে পড়ে, তাহলে এতে কোন সমস্যা নেই। {ইলাউস সুনান-৪/৩২৮}

মোদ্দাকথা, ফিক্বহের গ্রন্থে ইকামতের সময় দাড়ানো বিষয়ে যত মত আছে, এর মাঝে ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ বলার সময় দাড়ানোটি আদব কিন্তু আবশ্যক নয় এমনকি সুন্নাতে গায়রে মুয়াক্ক্বদাও নয়।

আদবের সংজ্ঞায় হানাফী মাজহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “আদদুররুল মুখতার” এ এভাবে উদ্ধৃত হয়েছে-

تركها لا يوجب اساءة ولا عتابا كترك سنة الزوائد لكن فعله افضل، (الدر المختار، كتاب الصلاة، باب صفة الصلاة-1/477)

অর্থাৎ এটি যে ছেড়ে দেয়, সে গোনাহগার ও অপরাধী সাব্যস্ত হয় না। যেমন সুন্নতে জায়েদা ছেড়ে দিলে হয় না। তবে এটি করা উত্তম। {রদ্দুল মুহতার-১/৪৭৭}

সুতরাং এর উপর আমলকারী কোন ব্যক্তি যদি তা ছেড়ে দেয় আর কোন ব্যক্তি যদি তাকে তাদের খারাপ ও মন্দ না বলে তাহলে সে আদবের উপর আমলকারী সাব্যস্ত হবে। আর যদি এটি পরিত্যাগকারীদের কেউ ভর্ৎসনা করে বা মন্দ বলে তাহলে উক্ত ব্যক্তি বিদআতি সাব্যস্ত হবে। কারণ যে কাজ করা আবশ্যক নয় অথবা সুন্নতও নয়, সেটিকে দ্বীনের মাঝে জরুরী মনে করা সুষ্পষ্ট বিদআত।

এখন আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, এক সময়ে যদি দু’টি কাজ একত্র হয়। যার একটি জরুরী। অপরটি জরুরী নয়। আর একটির উপর আমল করলে অপরটির উপর আমল করা সম্ভব নাও হতে পারে। অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত অনাবশ্যকীয় কাজটি করতে গিয়ে আবশ্যকীয় কাজ না করতে পারার আশংকা দেখা দেয়। এক্ষেত্রে শরয়ী মাসয়ালা হল জরুরী কাজটি করবে আর অনাবশ্যকীয় কাজটি ছেড়ে দিবে।।

এখন দেখে নেয়া যাক, উক্ত আলোচিত মাসআলার ব্যাপারে পুর্বেল্লিখিত প্রসিদ্ধ ফিক্বহ গ্রন্থ ‘আদদুররুল মুখতার’ এ কি এসেছে-

وشوع الامام فى الصلاة مذ قيل قد قامت الصلاة (رد المحتار-1/479)

কাদ কামাতিস সালাহ বলার সময় ইমামের নামায শুরু করা উচিত। {রদ্দুল মুহতার-১/৪৭৯}

এটিকেও আদবের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। তাই কোন ইমাম যদি ‘কাদ কামিতাস সালাহ’ বলার সময় নামায শুরু না করে, বরং ইকামত শেষ হবার পর নামায শুরু করে তাতেও কোন সমস্যা নেই।

এ কারণে লিখা হয়েছে-

ولو أخر حتى اتمها لا بأس به اجماعا (رد المحتار-1/479)

আর যদি ঐক্যমতের ভিত্তিতে ইকামত শেষ হওয়া পর্যন্ত দেরী করে এতেও কোন সমস্যা নেই। {প্রাগুক্ত}

এরপর এ দেরী করাটিকে প্রাধান্য পাওয়া বক্তব্য এবং উত্তম বলে এর স্বপক্ষে এ প্রমাণ পেশ করা যাক-

لأن فيه محافظة على فضيلة متابعة المؤذن وإعانة له على الشروع مع الامام (رد المحتار، كتاب الصلاة، آداب الصلاة قبيل “فصل”-1/479)

কেননা, এতে করে মুআজ্জিনের সম্মান রক্ষা করা হয়, আর ইমামের সাথে তার নামায শুরু করতে সহায়ক হয়ে থাকে। {রদ্দুল মুহতার-১/৪৭৯}

তো বুঝা গেল, আসলে ‘কাদ কামাতিস সালাহ’ বলার সময় নামায শুরু করা আদব। তবু বিশেষ কারণে দেরী করে নামায শুরু করাকে উত্তম সাব্যস্ত করা হয়েছে।

এমনিভাবে আলোচিত মাসআলাটিতে বিশেষ কারণে ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ বলার সময় দাড়ানোর বদলে ইকামতের শুরুতেই দাড়ানো উত্তম হবে। সেই বিশেষ কারণটি হল, কাতার সোজা করা। প্রথমে দাড়িয়ে গেলে কাতার সোজা করা সহজ হয়। আর কাতার সোজা করার কড়া নির্দেশসূচক বেশ কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। একথা আশা করি সবারই জানা। যা কি না নামজের ওয়াজীব বলে গণ্য।

একথাতো পরিস্কার যে, ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ বলার সময় মুসল্লিগণ দাঁড়ালে ইকামত শেষ হতে হতে মুসল্লিদের কাতার ভাল করে সোজা হবে না। এক্ষেত্রে হয়তো কাতার সোজা করা ছাড়াই নামায শুরু হবে, কিংবা কাতার সোজা করার জন্য দেরী করতে হবে, যা ইকামত ও নামায শুরু করার মাঝে দেরী করিয়ে ফেলবে। যা প্রমাণিত সত্য কথা।

সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হাদীসে আছে, বিলাল রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আসতে দেখে ইকামত বলা শুরু করতেন। আর অন্যরা কাতার সোজা করা শুরু করতেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জায়গায় পৌঁছার পূর্বেই কাতার পুরোপুরি সোজা হয়ে যেত। (সহীহ মুসলিম ১/২২০)

অপর হাদীসে আছে, মুআযযিন আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার বলে ইকামত বলামাত্রই লোকেরা নামাযের জন্য দাঁড়িয়ে যেত এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জায়গায় পৌঁছতে পৌঁছতে কাতার সোজা হয়ে যেত। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক ১/৫০৭) এসব হাদীস থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, মুক্তাদীগণ হাইয়া আলাল ফালাহ বলা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না; বরং ইকামতের শুরুতেই দাঁড়িয়ে যাবে।

মোদ্দাকথা হল, ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ বলার সময় দাড়ানো এটি কেবলি আদবের অন্তর্ভূক্ত। সুন্নত, ওয়াজিব কিছু নয়। কিন্তু একটি জরুরী কাজের জন্য এটিকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। যেমন ‘কাদ কামিতাস সালাহ’ বলার সময় নামায শুরু করা আদব। কিন্তু আরেকটি জরুরী কাজের জন্য তা পরিত্যাগ করা হয়। তেমনি এখানে এ আদবটি ছেড়ে দেয়া হয় কাতার সোজা করার মত জরুরী কাজের জন্য।

তাই এ কাজের উপর যদি কেউ অন্য কারো উপর অভিযোগ উত্থাপন ও ভর্ৎসনা ছাড়াই আমল করে তাহলে উক্ত ব্যক্তি আদবের উপর আমলকারী সাব্যস্ত হবে। আর যদি কেউ এ আদবের উপর যে আমল করে না, তাকে ভর্ৎসনা করে, খারাপ বলে তাহলে উক্ত ব্যক্তি বিদআতি সাব্যস্ত হবে। কারণ গায়রে বেজরুরী বিষয়কে জরুরী মনে করা বিদআত।আল্লাহ পাক সব্বাইকে সঠিক বুঝ দান করুন।। আমিন।।