বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনি।। উচ্চারণ স্থান অনুসারে বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেনীবিভাগ।।

বাংলা ভাষায় ব্যঞ্জনধ্বনি আছে মোটামুটিভাবে ৩৪টি – ক্, খ্, গ্, ঘ্, ঙ্, চ্, ছ্, জ্, ঝ্, ঞ্, ট্, ঠ্, ড্, ঢ্, ণ্, ত্, থ্, দ্, ধ্, ন্, প্, ফ্, ব্, ভ্, ম্, য়্, র্, ল্, শ্, ষ্, স্, হ্, ড়্, ঢ়্; যদিও বর্ণমালার ব্যঞ্জনবর্ণ ভাগে আরও কয়েকটি বর্ণ স্থান দেওয়া হয়েছে, যেমন—ঞ, ণ, য, ষ, স, ং, ঃ, ৎ, ঁ।

প্রথমেই জেনে নেয়া যাক ব্যঞ্জনধ্বনি কি? বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনি

উচ্চারনের সময় যে সব ধ্বনি নিজে নিজে উচ্চারিত হতে পারে না অর্থাৎ স্বরধ্বনির সাহায্য নিয়ে পুর্নাংগ রুপে উচ্চারিত হয় তাদেরকেই ব্যাঞ্জনধ্বনি বলা হয়। এই ধ্বনিগুলো উচ্চারণের সময় ফুসফুসতাড়িত শ্বাসবায়ুকে কোথাও না কোথাও বাধা দিতে হয়।।

এবারে জেনে নেয়া যাক ব্যঞ্জনধ্বনি কিভাবে উচ্চারিত হয়?

উৎপত্তিগত দিক দিয়ে স্বরধ্বনি‌র সঙ্গে ব‍্যঞ্জনধ্বনির একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আজকে আমাদের এই আলোচনায় আমরা সেই মৌলিক পর্থক‍্যটিতেই আলোকপাত করার চেষ্টা করব। উপরের ব্যঞ্জনধ্বনির সংজ্ঞা হতে আমরা যেনেছি যে, এই ধ্বনিগুলো উচ্চারণের সময় ফুসফুসতাড়িত শ্বাসবায়ুকে কোথাও না কোথাও বাধা দিতে হয়।।

এই প্রসঙ্গে প্রথমেই বলি, স্বর এবং ব‍্যঞ্জন, উভয় ধ্বনির উচ্চারণ সম্ভব হয় ফুসফুস হতে শ্বাস-বায়ু প্রবাহের ফলে। কিন্তু স্বরধ্বনি উচ্চারণ করার সময় সেই বায়ুকে বাগযন্ত্রের কোথাও বাধা দিতে হয় না পক্ষান্তরে ব্যঞ্জনধ্বনির বেলায় তা একান্ত অপরিহার্য। আর এই বাধার কারনেই ব্যাঞ্জনধ্বনির জন্ম তাই ব্যাঞ্জনধ্বনিকে আমরা বাধাজাত ধ্বনিও বলতে পারি।

বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণের এই বাধার প্রকৃতি ও স্থান ভিন্ন হতে পারে। সেই সাথে এর মাত্রাও ভিন্ন ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক।

উচ্চারণ স্থান অনুসারে বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেনীবিভাগ করার সময় এই শাস-বায়ুজাত বাধা কোথায় কি পরিমানে প্রাপ্ত হয়েছে তা বিবেচ্য বিষয়। অর্থাৎ বাধার স্থান ও বাধার মাত্রা—এই দুটি বিষয় ব‍্যঞ্জনের শ্রেণিবিভাগ করার ক্ষেত্রে অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়।

উচ্চারণ স্থান অনুসারে বাংলা ব্যাঞ্জনধ্বনির শ্রেনীবিভাগঃ

বাংলা বেশির ভাগ ব্যাঞ্জনধ্বনিই উচ্চারিত হয় মুখবিবরে। অর্থাৎ এই ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো উচ্চারনের সময় ফুসফুসীয় শ্বাসবায়ু মুখবিবরের কথাও না কোথাও বাধাপ্রাপ্ত হয়।। আর শ্বাসবায়ুর এই বাধা অতিক্রম করেই ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো উচ্চারিত হয়। এবারে আমরা এই বাধা দেয়ার স্থানগুলো তথা প্রত্যংগগুলো চিনে নিব এবং কোন কোন স্থান থেকে কোন কোন ধ্বনিগুলো উচ্চারিত হয় তা জেনে নেবার চেষ্টা করব।

কণ্ঠ–কণ্ঠ‍্য ব‍্যঞ্জন বা কণ্ঠ্যধ্বনি

কণ্ঠ হল আমাদের মুখবিবরের সবচেয়ে ভিতরের দিকের উপরের অংশ। অর্থাৎ মুখের যেটা ছাদ তার ঠিক পিছন দিকটা‌কেই আমরা কণ্ঠ বলে থাকি। এখানে কোনো ধ্বনি উচ্চারণ করার জন‍্য জিহ্বার পিছন দিকটা এখানে স্পর্শ করে বা কাছাকাছি যায়। এই স্থানে উচ্চারিত ব‍্যঞ্জন‌গুলিকে বলে কণ্ঠ‍্য ব‍্যঞ্জন। বাংলায় ক,খ,গ,ঘ,ঙ–এই ব‍্যঞ্জন‌গুলি কণ্ঠ‍্য ব‍্যঞ্জন বা কণ্ঠ্যধ্বনির উদাহরণ।

তালু–তালব‍্য ব‍্যঞ্জন

তালু হল মুখগহ্বরের উপরের সামনের অংশটি। দাঁতের গোড়ায় যে উঁচু মত অংশটা আছে, তার থেকে একটু পিছিয়ে গেলে যে অপেক্ষা‌কৃত নিচু অংশটা পাওয়া যায় সেটাই হল তালু। জিভ দিয়ে এই ব‍্যাপারগুলো বুঝে নিতে হবে। এছাড়া উদাহরণে‌র ধ্বনিগুলো উচ্চারণ করার সময় স্পর্শ‌টা কোথায় হচ্ছে সেটা দেখেও স্থানগুলো চিনে নেওয়া যায়। যাই হোক, তালুতে কোনো ব‍্যঞ্জনকে উচ্চারণ করার জন‍্য জিহ্বা‌র সামনের দিকের উপরের অংশ তালুতে স্পর্শ করে বা কাছাকাছি যায়। এখানে উচ্চারিত ব‍্যঞ্জন‌গুলি‌কে বলে তালব‍্য ব‍্যঞ্জন। 

বাংলায় চ,ছ,জ,ঝ,ঞ,ল,শ–এইগুলি তালব‍্য ব‍্যঞ্জনের উদাহরণ।

মূর্ধা–মূর্ধণ‍্য ব‍্যঞ্জন

মূর্ধা হল তালুর সবচেয়ে উঁচু অংশ। এটি তালুর পেছনের অংশ এবং কণ্ঠের সামনের অংশ। এখানে স্পর্শ করার জন‍্য জিহ্বার ডগার অংশটি ব‍্যবহার করতে হয়। এখানে স্পর্শ করার জন‍্য জিহ্বার ডগা উল্টে নিয়ে জিহ্বা‌র তলার অংশটা দিয়ে স্পর্শ করতে হয়। মূর্ধায় উচ্চারিত ব‍্যঞ্জন‌গুলিকে মূর্ধণ‍্য ব‍্যঞ্জন বলে। বাংলায় মূর্ধণ‍্য ব‍্যঞ্জন‌গুলি হল, ট,ঠ,ড,ঢ,ণ(এর নাম ‘মূর্ধণ‍্য-ণ; শুধু ‘মূর্ধণ‍্য’ বলা উচিত নয়),ড়,ঢ়,ষ।

দন্ত–দন্ত‍্য ব‍্যঞ্জন

দন্ত মানে দাঁত। এখানে ধ্বনি উচ্চারণ করার জন‍্য জিভের ডগা দাঁতে স্পর্শ করে । তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রকৃত স্পর্শ দাঁতের গোড়ায় বা দন্তমূলে হয়ে থাকে। ব‍্যক্তিগত অভ‍্যাস‌ও এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব‍্যাপার। মোট কথা, দন্ত বা দন্তমূল, দুই জায়গাতেই এক‌ই ব‍্যঞ্জনের উচ্চারণ সম্ভব। দন্তে উচ্চারিত ধ্বনিগুলি দন্ত‍্য ধ্বনি নামে পরিচিত। বাংলা দন্ত‍্য ব‍্যঞ্জন‌গুলি হল, ত,থ,দ,ধ,ন।

ওষ্ঠ–ঔষ্ঠ‍্য ব‍্যঞ্জন

ওষ্ঠ বলতে বোঝায় উপরের ঠোঁট। নিচের ঠোঁটের পোষাকি নাম অধর। অধর ওষ্ঠকে স্পর্শ করে শ্বাসবায়ুকে বাধা দিয়ে যে ব‍্যঞ্জন‌গুলি সৃষ্টি করে, তাদের ঔষ্ঠ‍্য ব‍্যঞ্জন বলে। তবে অনেক সময় নিচের ঠোঁট দাঁতকেও স্পর্শ করে বা কাছে যায়। তবে এরকম ঘটনা কোনো বাংলা ব‍্যঞ্জনের সঠিক উচ্চারণের ক্ষেত্রে ঘটে না। বাংলা ঔষ্ঠ‍্য ব‍্যঞ্জন‌গুলি হল, প,ফ,ব,ভ,ম এবং অন্তঃস্থ ব।

আর এক ধরনের ব্যঞ্জন আছে, যাদের বলে ‘দন্তৌষ্ঠ্য’ ব্যঞ্জন। নিচের ঠোঁট উপরের দাঁতকে স্পর্শ করে শ্বাসবায়ুর গতি রুদ্ধ করলে এমন ধ্বনি সৃষ্টি হয়। বাংলায় এমন ব্যঞ্জন নেই বললেই চলে তবে ইংরেজিতে f এই ধরনের ব্যঞ্জনধ্বনির উদাহরণ।

এছাড়া আর একটি স্থানে ব‍্যঞ্জনের উচ্চারণ সম্ভব, সেটি হল কণ্ঠনালী। বাংলায় কণ্ঠনালীয় ব‍্যঞ্জন একটিই— সেটি হল , হ।

আশা করি উচ্চারণ স্থান অনুসারে বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেনীবিভাগ সকলের কাছে পরিস্কার হয়ে গেছে। এতক্ষণ সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।।